ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩
Daily Bangladesh Diganta

অঢেল সম্পদের মালিক ভূমি কর্মকর্তা জয়নাল!বাহারছড়া ভূমি অফিসে দুর্নীতির রামরাজত্ব!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০১:৩২ পিএম

অঢেল সম্পদের মালিক ভূমি কর্মকর্তা জয়নাল!বাহারছড়া ভূমি অফিসে দুর্নীতির রামরাজত্ব!

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন পরিণত হয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে নিয়মিত হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে। দায়িত্বে যোগদানের পর থেকেই অফিসটিতে ‘পদে পদে ঘুষ’ ছাড়া কোনো সেবা মিলছে না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে মহেশখালীর কেরুনতলী ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই জয়নাল আবেদীনের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার কালারমারছড়া ও কেরুনতলী ইউনিয়নের অধীন প্রায় ৭ হাজার একর জমি ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অধিগ্রহণের সময় থেকেই তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

২০১৮ সালের শেষ দিকে এলএ মামলা নং ০৪/২০১৩-১৪-এর আওতায় ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণ শুরু হলে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি কালারমারছড়া ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই অবৈধ সম্পদ অর্জনের গতি আরও বেড়ে যায় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

২০১৯-২০২০ করবর্ষে জয়নালের আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত কর্মকর্তারা দেখতে পান, তিনি নিজের নামে ১৪টি দলিল ও তার স্ত্রী রোকেয়া বেগমের নামে ৩টি দলিলমূলে কৃষিজমি ক্রয় করেছেন। যা একজন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এছাড়া অনুসন্ধানে জানা গেছে— কক্সবাজার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পেশকারপাড়ায় নিজ নামে চারতলা বসতবাড়ি নির্মাণ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যে ২০ শতক জমি ক্রয়,
চেইন্দা মৌজার কাইমারঘোনা মসজিদের পাশে ২০ শতক জমি ও ভাড়াঘর ক্রয় করেছেন।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, জয়নালের স্ত্রী রোকেয়া বেগমের নামে ন্যাশনাল ব্যাংক, কক্সবাজার শাখায় ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় মোট ১৪ লাখ ১০ হাজার ৫৪২ টাকা জমা হয়, যার বৈধ উৎসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাহারছড়া ভূমি অফিসে যোগদানের পর জয়নাল নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর সুবাদে খাস জমি দখল ও কৃষিজমি ভরাটের মতো গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রেও তিনি নীরব ভূমিকা পালন করেছেন বলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জয়নালের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ক্ষেত্র হলো জমির নামজারি বা মিউটেশন। সরকারি নির্ধারিত ফি উপেক্ষা করে তিনি জমির মালিকদের বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করেন এবং ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে’—এমন কথা বলে ১০ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে ঘুষ আদায় করেন।

অনলাইনে দাখিলা দিতে গেলেও চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরুপায় হয়ে জমির মালিকরা হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য হন।

ভুক্তভোগীরা জানান, বাহারছড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া কোনো নামজারি কার্যত অসম্ভব। আদায়কৃত অর্থ উপজেলা ভূমি অফিসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা বলা হয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দুর্নীতি ও নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জয়নাল আবেদীনকে আটক করেছিল।

এ ব্যাপারে জানতে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীনের মুঠোফোনে একাধিক বার যোগাযোগ করেও তার মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি।
একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ধারাবাহিক অভিযোগ ও সম্পদের পাহাড় যদি যথাযথ তদন্তের বাইরে থেকে যায়, তাহলে ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন প্রশ্ন একটাই—অভিযোগের পর অভিযোগ উঠছে জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা বাড়লেও এখনো দৃশ্যমান কোনো তদন্ত শুরু হয়নি—যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।

ডেইলি বাংলাদেশ দিগন্ত

banner
Link copied!