দেশের নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ সচল রাখতে পরিচালিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কয়েকটি ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে সরকারি অর্থের অপচয়, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি, বেসরকারি ড্রেজার ব্যবহারে স্বচ্ছতার ঘাটতি, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং ড্রেজার রক্ষণাবেক্ষণ খাতে আর্থিক অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের নামও এসেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ভোলা-লাহারা, বরগুনা-আমতলী, পটুয়াখালী এবং বরিশাল সদরসহ কয়েকটি নৌপথে পরিচালিত ড্রেজিং কার্যক্রমে বাস্তব কাজের সঙ্গে দাপ্তরিক নথির তথ্যের অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে ড্রেজার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত না হলেও জ্বালানি তেল ব্যবহারের বিল দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে খননকৃত বালু ও পলি নির্ধারিত স্থানে অপসারণ না করে নদীতেই ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যার ফলে একই এলাকায় পুনরায় পলি জমে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন দেখা দেয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ড্রেজিং কার্যক্রমের দৈনিক লগবই, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব এবং খননকাজের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্যের সঙ্গে দাপ্তরিক রেকর্ডের মিল পাওয়া যায় না।
বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ড্রেজার ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, কিছু সরকারি ড্রেজার দীর্ঘ সময় অচল থাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ নির্ধারণ ও বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ড্রেজার মেরামত ও যন্ত্রাংশ ক্রয় খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে যথাযথ জবাবদিহির অভাব দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
নৌপথ ব্যবহারকারী কয়েকজনের অভিযোগ, প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে প্রত্যাশিত নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের মতে, ড্রেজিং কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং এবং কার্যকর কারিগরি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা দাবি করেন, বিভাগে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে অসন্তোষ রয়েছে। তার ভাষ্য, এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে প্রশাসনিক চাপের আশঙ্কা থাকে। তবে এই বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো তাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্রও জানিয়েছে, অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য যাচাই শেষে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের মতে, ড্রেজিং কার্যক্রমকে কার্যকর করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিয়মিত কারিগরি তদারকি এবং স্বাধীন নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের মত দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ড্রেজিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা গেলে একদিকে যেমন জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং নৌপথ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাও আরও জোরদার হবে।

