বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর গাবতলী বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার) নায়েব আলীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজস্ব আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় অধিকাংশ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিআরটিসিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির সুষ্ঠু হিসাব নিরূপণের স্বার্থে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে পূর্বের সব বিভাগীয় মামলা ও অভিযোগ পুনঃতদন্ত করা জরুরি।
২০১৬ সালে জোয়ার সাহারা বাস ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালে বাস মেরামত না করেই ভাউচারের মাধ্যমে বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে।
২০১৬ সালের ১৮ মে তৎকালীন মন্ত্রীর ডিপো পরিদর্শনের সময় কয়েকটি বাস (নম্বর ৫-৭৩৯, ৫-৭৮১ ও ৫-৩৮১) অত্যন্ত নিম্নমানের এবং চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্পোরেশনের আদেশে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বরখাস্তের আদেশ বাতিল করিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নায়েব আলীর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে মতিঝিল বাস ডিপোতে ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এলওসি-২ প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে আমদানিকৃত ৩৫টি নতুন বাস সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়ায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার ৮৭ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়।
কর্পোরেশনের একটি চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, এ ঘটনায় সরাসরি প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়। একইসঙ্গে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকারও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অভিযোগে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (মামলা নং-১৭৮৫) দায়ের করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করে তিনি প্রথমে প্রাপ্ত দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি কমিয়ে এক বছরে নামিয়ে আনতে সক্ষম হন।
খুলনা বাস ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালেও অনিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কর্পোরেশনের একটি পত্রের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দিয়ে ৪,৮৭১৯০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন তিনি এবং কোনো কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হননি তিনি ।
বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় অনেক অভিযোগ আলোর মুখ দেখেনি।
তাদের মতে, বিআরটিসির আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব বিভাগীয় মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আর্থিক অনিয়মগুলো দুদক পুনরায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি।

